শিরোনাম :
বিজিবিকে স্মার্ট প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা হচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী ভবন-স্থাপনার সামনে ‘সতর্কতা নোটিশ’ প্রদর্শন করতে হবে বাড়িতে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নারীর মাদক বিক্রি রাজশাহী মহানগরীতে গ্যাস সিলিন্ডার কেটে বিক্রির সময় গ্রেপ্তার ৩ রাজশাহী মহানগরীতে পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার – ১৮ মোহনপুরে বিপুল পরিমান গাঁজা-সহ গ্রেফতার মাদক কারবারী রানবীর জাহান রাজশাহী জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতারণ সিরাজগঞ্জে ছিনতাই চক্রের সক্রিয় ৫জন সদস্য গ্রেফতার চকলেটের প্রলোভনে সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা রুয়েট কেন্দ্রে ১ম বর্ষ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন
বাবার মৃত্যুর ক্ষোভে চাকরি প্রত্যাখ্যান করলেন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে

বাবার মৃত্যুর ক্ষোভে চাকরি প্রত্যাখ্যান করলেন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে

বাবার মৃত্যুর ক্ষোভে চাকরি প্রত্যাখ্যান করলেন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে
বাবার মৃত্যুর ক্ষোভে চাকরি প্রত্যাখ্যান করলেন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে

মতিহার বার্তা ডেস্ক: জেলা প্রশাসকের দেয়া চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন দিনাজপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন হওয়া মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলে নুর ইসলাম।

জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন নুর ইসলাম। কারণ এর আগে হুইপ ইকবালুর রহিমের সুপারিশে চাকরি হয়েছিল তার। এ অবস্থায় হুইপ যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা মেনে নেবেন নুর ইসলাম।

একই সঙ্গে এ ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান চেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী নুর নাহার বেগম ও ছেলে নুরুজ্জামান। নুর ইসলামের চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে সম্মতি রয়েছে তাদের।

মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী নুর নাহার বেগম বলেন, আমার ছেলেকে বিনা অপরাধে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। যার কারণে স্বামীকে হারিয়েছি আমি। এ ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে।

এদিকে, মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফনের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। শনিবার দুপুরে বিভাগীয় কমিশনার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. জাকির হোসেন ঘটনা তদন্তে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে যান।

গত বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) চিঠিতে লিখে যাওয়া অসিয়ত অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অব অনার) ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনকে দাফন করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে একটি চিঠি লেখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন।

দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন তার গাড়িচালক ছেলেকে চাকরি ও বাস্তুচ্যুত করাসহ মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে এই চিঠি লিখেছেন। বুধবার রাতে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। পরিবারের আপত্তির কারণে তাকে গার্ড অব অনার ছাড়াই দাফন করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ‘পেটে লাথি মেরেছে ওরা, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা না হয়’ শিরোনামে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপরই বিষয়টি নিয়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। সেই সঙ্গে নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় (২৫ অক্টোবর) মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে যান দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম। এ সময় মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী নুর নাহার বেগম ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক।

ওই সময় মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী নুর নাহার বেগম ও পরিবারের সদস্যদের জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম বলেছেন, নুর ইসলামকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়া হবে। সরকারি যে বাড়িতে থাকতেন সে বাড়িতেই থাকবে নুর ইসলাম ও তার পরিবার।

শুক্রবার রাতে জেলা প্রশাসকের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়, দিনাজপুরের অভিমানী সেই মুক্তিযোদ্ধার ছেলে ফিরে পেলেন চাকরি। তবে ওই সময় নুর ইসলাম এবং পরিবারের সদস্যরা জেলা প্রশাসকের চাকরির প্রস্তাবে সম্মতি দেননি।

শনিবার মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের ছেলে নুর ইসলাম বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক আমাদের বাড়িতে আসেন। আমরা তাকে সম্মানের সঙ্গে কথা বলে বিদায় দিয়েছি। তিনি চাকরি ও বাড়ি ফেরতের কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা কোনো সিদ্ধান্ত দেইনি। আমি তার চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের সুপারিশে আমার চাকরি হয়েছিল। অথচ সেই চাকরি খেয়ে ফেলেছেন জেলা প্রশাসক। এই শোকে বাবা মারা গেলেন। বাবার মৃত্যুর সুযোগে চাকরি দিতে চাচ্ছেন জেলা প্রশাসক। কয়েকদিন পর যে আবার ঘাড় ধাক্কা দিয়ে চাকরি থেকে বের করে দেবে না তার নিশ্চয়তা কী?। তাই আমি তার চাকরি প্রত্যাখ্যান করেছি।

নুর ইসলামের বড় ভাই নুরুজ্জামান বলেন, হুইপ ইকবালুর রহিমের সুপারিশে নুর ইসলামের চাকরি হয়েছিল। তিনি আমাদের অভিভাবক, বর্তমানে তিনি দিনাজপুরে নেই। বাবার মৃত্যুর পর চাকরি দিতে চাচ্ছেন জেলা প্রশাসক। এজন্য আমরা না করেছি। তবে হুইপ যে সিদ্ধান্ত দেবেন, আমরা তা মেনে নেব।

নুরুজ্জামান আরও বলেন, আমার বাবা জীবদ্দশায় যে জেলা প্রশাসকের সাক্ষাৎ পাননি, মরণের পরও যাদের কারণে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গ্রহণ করেননি, তাদের কথায় ভরসা পাই না আমরা।

নুর ইসলামের স্ত্রী রুবিনা বেগম বলেন, আমাদের সঙ্গে যা করা হয়েছে তা আগে সিনেমায় দেখতাম। অথচ আমাদের জীবনে ঘটলো এমন ঘটনা। দুই ছেলে এক মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে আজ অসহায় আমরা। এর সুষ্ঠু বিচার চাই।

অপরদিকে শনিবার দুপুরে বিভাগীয় কমিশনার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মোঃ জাকির হোসেন ঘটনা তদন্তে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইসমাইল হোসেনের বাড়ীতে যান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সদর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লোকমান হাকিম, দিনাজপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোরাম নবী দুলাল।

বিভাগীয় কমিশনার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. জাকির হোসেন বলেন, আমি ঘটনা তদন্তে এসেছি। মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েছি। নুর ইসলামকে লিখিত বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে যারা দোষী প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা যায়, নুর ইসলাম সদর এসিল্যান্ডের গাড়ি চালাতেন। কর্মস্থলে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হুইপ ইকবালুর রহিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বিষয়টি দেখবেন বলে সেখানে উপস্থিত এডিসি রাজস্বকে বিষয়টি দেখতে বলেন হুইপ।

হুইপকে বিষয়টি অবগত করায় প্রশাসন থেকে প্রথমে নুর ইসলামকে তার বসবাসরত খাস পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেয়া হয়। গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে নুর ইসলামকে বাথরুম পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন এসিল্যান্ডের স্ত্রী। মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।

পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকারিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেলা প্রশাসকও ক্ষিপ্ত হন। তখন নুর ইসলাম তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য এসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দেখা করতে পারেননি। চাকরি চলে যাওয়ায় নিরূপায় হয়ে হুইপ ইকবালুর রহিমের সঙ্গে দেখা করেন তারা। কিন্তু প্রশাসন সেটি চরম নেগেটিভভাবে নেয়। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নুর ইসলাম চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত। এ অবস্থায় পরিবার নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নুর ইসলাম।

ছেলের বিষয়টি হুইপকে জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন চিঠিতে লিখেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়ে করা স্বাধীন দেশে আমার ছেলের রুজি রোজগারটুকু অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া হলো। গত ২১ অক্টোবর থেকে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের ২নং ওয়ার্ডের ৪৪নং বেডে চিকিৎসাধীন আমি। এ অবস্থায় এই পত্রটি তোমার কাছে লিখছি। তোমার কাছে আমার আকুল আবেদন তুমি ন্যায়বিচার করো।’

মুক্তিযোদ্ধা লিখেছেন, ‘ঠুনকো অজুহাতে আমার ছেলেটিকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করো। আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ চাকরিচ্যুত হওয়ায় একে তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না।’

২২ অক্টোবর নিজের লেখা চিঠিটিতে স্বাক্ষর করে ডাকযোগে ঢাকায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের কাছে এ চিঠি পাঠিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন। পরদিন ২৩ অক্টোবর বেলা ১১টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টায় সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের জানাজা শুরুর পূর্ব মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের একটি চৌকশ দল গার্ড অব অনার প্রদান করার জন্য যান।

এ সময় স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা জানান, জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লিখে যাওয়া চিঠির অসিয়ত অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন বা গার্ড অব অনার প্রদান করতে দেবেন না। তাদের ভাষায়, এটাই হবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ইসমাইল হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সুত্র: জাগো নিউজ

মতিহার বার্তা ডট কম – ২৫ অক্টোবর ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply