শিরোনাম :
সাধারণ মানুষ সমাবেশ প্রত্যাখান করেছে, রাসিক মেয়র লিটন রাজশাহী নগরীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে বিএনপির গণসমাবেশ শুরু কাজ হল না বিষেও! আসামির মৃত্যু নিশ্চিত করতে ভয়ঙ্কর পন্থা নিলেন জেল কর্তৃপক্ষ সঙ্গ পেতে মহিলাকে নিয়ে কলকাতার হোটেলে, প্রতিশ্রুতি মতো টাকা না দেওয়ায় ধৃত ৩ বাংলাদেশি প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে এখন লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছেন না স্পেনের কোচ, কেন? বদলের ব্রাজিলে নজিরের মুখে দাঁড়িয়ে আলভেস, পেলেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে নামছে সেলেকাওরা বিশ্বকাপে নেমারের খেলার সম্ভাবনা নিয়ে এ বার মুখ খুললেন তাঁর বাবা রাজশাহীতে আনোয়ার হোসেন উজ্জলের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষের মিছিল অনুষ্ঠিত শীত উপেক্ষা করে খোলা মাঠে রাত কাটালো বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজশাহীতে বিএনপির সমাবেশে যেতে পথে পথে বাধা
দেশব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যার মিছিল; নেপথ্যে কি?

দেশব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যার মিছিল; নেপথ্যে কি?

রাবি প্রতিনিধি: দেশব্যাপী উচ্চ শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার উৎসব চলছে। আত্মহত্যা যদিও একটা সামাজিক ব্যাধি; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা অন্য পাঁচটা আত্মহত্যার চেয়ে মর্মান্তিক। যেসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ হয়, সেইসব স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে এসেও কেনো শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করবে- জনমনে প্রশ্নওঠা স্বাভাবিক।

বিশ্ববিদ্যালয় হল স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার উন্মুক্ত প্রাঙ্গন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় অর্জিত জ্ঞান শুধু জ্ঞানই নয়; অর্জিত জ্ঞানের স্বকীয়তা বজায় থাকে, যার মাধ্যমে মানুষের মনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একের পর এক আত্মহত্যা তাঁদের অমূল্য জীবনের মূল্যনির্ধারণে অনুদারতার পরিচয়; যা দেশের মানুষকে বিব্রত, শঙ্কিত, আতঙ্কিত করছে। অনেক স্বপ্নময় জীবনের আশা নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অসীম সম্ভাবনার মধ্যে দাঁড়িয়েও শিক্ষার্থীরা কেনো এবং কোন যুক্তিতে আত্মহত্যা করছে বিষয়গুলো অবশ্যই ভেবে দেখা দরকার।

আত্মহত্যা অবশ্যই অনৈতিক,আত্মবিধ্বংসী ও কাপুরুষোচিত কাজ ; এর পক্ষে সাফাই গাওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে একথা সত্য, এর দায় আমাদের সমাজ এবং প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা কোনমতেই এড়াতে পারেনা।

প্রত্যেকটা আত্মহত্যার আলাদা কারণ থাকতে পারে। আমার মতে প্রত্যেকটা কারণই একইসূত্রে গাঁথা; হতাশা থেকেই এই আত্মহননের সূত্রপাত। কিন্তু এই হতাশা কোথা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে? হতাশার উৎসস্থল সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি।

সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী প্রতীকের আত্মহননের মাধ্যমে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক নিয়োগে দৃশ্যমান -অদৃশ্যমান শক্তির প্রভাব বিস্তার জাতির সামনে কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরিবারের ভাষ্যমতে, অনার্সে প্রথম হওয়া ছেলেটিকে মাস্টার্সে নাম্বার কমিয়ে দেওয়ার অর্থ তাকে বাদ দিয়ে শিক্ষকদের পছন্দের অন্য কাউকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নভঙ্গের হতাশা থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় প্রতীক।

ঠিক একইভাবে গতবছর পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া দেবাশীষ মন্ডল নামে আরো একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। চাকরি পাওয়ার শর্তে কর্তৃপক্ষের ঘুষের আবদার পূরণে ১৫ লাখ টাকা জোগাড় করেও শেষের দিকে অদৃশ্য সুতার টানে সব আটকে যায়। স্বপ্ন ভঙ্গের হতাশায় রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে দেবাশীষ মন্ডল।সময়ের ব্যবধানে আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই,

কিন্তু সেই হারে দুর্নীতি কমছে না। দুর্নীতি শুধু নিয়োগেই নয়, নিয়োগের আগে পছন্দের প্রার্থীকে প্রথম, দ্বিতীয় বানাতে যতো কাণ্ড ঘটে সবগুলো অন্তত একজন শিক্ষকের নীতি বিবর্জিত। একজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে কোন পরীক্ষার খাতা মূল্যায়িত হতে পারে না, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসব ঘটনা প্রায়শই ঘটছে।

একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের কাছে বরাবরই আশা আকাঙ্খার ভরসাস্থল, আলোর পথের দিশারী।
যখন একজন শিক্ষকের নৈতিক স্খলন ঘটে তখন শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। যারা যোগ্য তা‌ঁদের প্র‌তি সম্মান রে‌খে বল‌ছি, এই যে দিনের পর দিন অযোগ্য লোকজন শিক্ষক হচ্ছেন তার ফল কিন্তু আমরা পাচ্ছি। আজ যখন শিক্ষার্থীরা একাডেমিক হতাশায় আত্মহত্যা করছে, তখন তথাকথিত শিক্ষকসমাজ দায় এড়াতে পারে না। অনৈতিকভাবে নিয়োগকৃত শিক্ষকের কর্মকাণ্ড কখনোই শিক্ষকসুলভ হয় না।

একজন অযোগ্য লোক শিক্ষক হওয়া মানে তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীব‌নে হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে বঞ্চিত করা। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বলা হয় জাতির বিবেক, সেই শিক্ষক যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয় তাহলে জাতির নৈতিকতা তখন আস্তাকুঁড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। জাতি গঠনের কারিগর নিয়োগে সচ্ছতা, নিরপেক্ষতা থাকা অপরিহার্য।

আমাদের দেশে ছাত্রসংগঠনের গুলোর মাঝেও জ্ঞানের চর্চা খুবই ক্ষীণ। প্রায়শই দেখা যায় একজন শিক্ষার্থী আবেগের বশীভূত হয়ে অসুস্থ ছাত্ররাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করার পর পড়াশোনার চর্চাটাই ভুলে যায়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসরমান অবস্থায় যখন বাস্তবতা বুঝতে শেখে তখন হতাশায় হয় তাদের একমাত্র অবলম্বন

একজন শিক্ষার্থী যখন স্কুল, কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় তার স্বপ্নের সাথে পরিবারের স্বপ্নগুলো যেন নতুন মাত্রা যোগ করে; আর একটা সময় পর সকলের প্রত্যাশার চাপ যখন সে বুঝতে শেখে, তখন এই শিক্ষা ব্যবস্থা তাঁকে চরম ভাবে হতাশ করে।

আমাদের সমাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সরকারি চাকরী ব্যতীত জীবন মূল্যহীন। কিন্তু বাস্তবে একটা সরকারি চাকরী দিয়ে কখনোই জীবনের মূল্য নির্ধারিত হতে পারেনা।

পরিবার এবং সমাজের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা, প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্ষীয়মাণ সুযোগ তাঁদের বিষন্নতাকে হতাশায়, হতাশাকে ভয় আর ভয় ভবিষ্যতকে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে পরিণত করে। প্রত্যেকটা আত্মহত্যার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে আমাদের অসচেতন পরিবারগুলো। প্রেম বিষয়ক জটিলতা, প্রত্যাশিত চাকুরি না পাওয়ার আক্ষেপ, অন্যান্য যেকোন সমস্যায় একজন মানুষ যখন ব্যর্থ হয় তখন সে পরিবারের উপর পুরো নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাহিরের প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করতে তাঁকে তাঁর পরিবার সাহায্য করবে, তাঁকে মনোবল জুগিয়ে মন শক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিবে এই আশায় থাকে। কিন্তু যখন পরিবার তাঁকে আরো অবহেলা করে, বিপরীত কথা শোনায় তখন সে আর তা সহ্য করতে পারেনা। সে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করে। নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে করে সে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আমাদের প্রত্যেকটা পরিবারে অন্তত এমন একজন সদস্য থাকা উচিত যাকে নিঃসঙ্কোচে সবকিছু বলা যায়। পুরো পৃথিবী বিপক্ষে দাঁড়ালেও অন্তত পরিবার পাশে দাঁড়াবে, এমন ভরসা থাকা খুব দরকার।

আমরা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে যতোই অগ্রসর হচ্ছি আমাদের মাঝে প্রতিযোগিতার মনোভাব ততোই বাড়ছে। আমাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্কের বন্ধন কমতে শুরু করেছে। এতে করে আমাদের নিজেদের সমস্যাগুলি একে অন্যকে মনখুলে বলতে পারছি না। ফলে এক প্রকার হতাশা থেকে আত্মহত্যার জন্ম হয়। একজন আত্মহত্যা করলে আশেপাশে থাকা ব্যক্তিরা একই ধরনের সমস্যার জন্য আত্মহত্যাকে সমাধান হিসেবে বেছে নেয়। যার কারণে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং সমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে ।

আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সঠিক সমাধান নয়।জীবন আপনার। আপনি আপনার জীবন রাখবেন কি রাখবেন না তা একান্তই আপনার ব্যাপার; তর্কের খাতিরে এটি মেনে নিলাম। কিন্তু আপনার জীবনের সঙ্গে যদি আরো কিছু জীবন জড়িয়ে থাকে, তাহলে আপনার জীবনের মালিকানা শুধুমাত্র আপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কাজেই চাইলেও আপনি আত্মহনন করতে পারেন না। কেননা, আপনার একটি অপমৃত্যু আরো কিছু মানুষকে জিন্দালাশে পরিণত করবে, যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। কাজেই আত্মহত্যা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।

আপনি যদি সফল হতে চান, তাহলে আপনার জন্য সম্ভাবনাময় অনেক পথ খোলা আছে। কোন বিশেষ চাকরি, পেশা বা ভালো ফলাফলকে নিজের সফলতার গন্তব্য ভাবা কোন সুবিবেচকের কাজ নয়।

জীবনে অনেকবার আপনাকে থেমে যেতে হবে, অনেক স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটবে, বারবার হেরে যাওয়ার পরেও নতুন স্বপ্ন দেখতে হবে, আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে কারণ শেষ হাসিটা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। সর্বোপরি, আপনাকে আশাবাদী হতে হবে। আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে- দূঃখ উপেক্ষা করে সুখ আসবেই।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

মতিহার বার্তা ডট কম  ২৮ জানুয়ারী ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *