যারা প্রথমবার উমরাহ করতে যাওয়ার চিন্তা করছেন, তাদের জন্য –

যারা প্রথমবার উমরাহ করতে যাওয়ার চিন্তা করছেন, তাদের জন্য –

মতিহার বার্তা ডেস্ক : ১. হজ্জের আগে উমরাহ করা যাবে না, এটি ভুল ধারণা। আনুমানিক এক লক্ষ টাকার মধ্যে উমরাহ প্যাকেজ পাওয়া সম্ভব, যা অনেকের সামর্থ্যের মধ্যে। এটি হজ্জের এক ধরণের প্রস্তুতি হিসেবেও কাজ করবে।

২. উমরাহর কার্যক্রম মোটেই কঠিন নয়। মক্কায় হোটেলে পৌঁছানোর আনুমানিক তিন ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব। বড় কোনো সূরা বা দোয়া মুখস্থ করারও প্রয়োজন নেই। অল্প কিছু যা অতিরিক্ত জানা প্রয়োজন তাও এক-দুই লাইনের করে। মুখস্থ না করতে পারলে, কাগজে লিখে সেখান থেকে পড়লেও চলবে।

৩. গাইড থাকলে ভালো, না থাকলেও চলবে। যদি গাইড না থাকে, জানার জন্য একটু পড়ালেখা করা লাগবে, অভিজ্ঞদের সাথে কথা বলা লাগবে – এই আরকি। ইউটিউবেও কিছু ভালো ভিডিও আছে যা দেখা যেতে পারে।

৪. উমরাহর জন্য এক-দুই সপ্তাহ মক্কা-মদিনায় থাকা জরুরি না। যেহেতু অনেক টাকা প্লেন ভাড়া দিয়ে যাচ্ছেন এবং ভালো লাগার মতো জায়গা, সে জন্যই বেশি দিন থাকা। অন্যথায় অল্প কিছু দিনের পরিকল্পনা করলেও সমস্যা নাই।

৫. আমার কাছে আগে মদিনা যাওয়া উত্তম মনে হয়েছে।

শুরুতে মক্কা গেলে, লম্বা ভ্রমণ শেষেই উমরাহর বাধ্যবাধকতাগুলো শেষ করতে হবে। রাতে ফ্লাইট থাকলে ঘুম হবে না। ফ্লাইটের আগে-পরের সময়, এয়ারপোর্টে যাওয়া-আসার সময়, ইত্যাদি যোগ করলে ভ্রমণের সময় বেশ লম্বাই। উমরাহ কার্যক্রমে খালি পায়ে আনুমানিক দুই ঘণ্টা হাঁটতে হবে। আরামদায়ক জীবনযাপনে অভ্যস্তদের জন্য বা দলের দুর্বল সদস্যদের (বৃদ্ধ, নারী, শিশু) জন্য পরপর এত কিছু করা একটু কষ্টকর হয়ে যেতে পারে।

শুরুতে মদিনা গেলে, লম্বা ভ্রমণ শেষে বিশ্রামের এবং নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর সুযোগ পাওয়া যাবে। ওখানে কিছুদিন থেকে তারপর আরামে উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা রওয়ানা দেয়া যাবে।

৬. এক-দুই সপ্তাহ থাকবেন যেহেতু, মসজিদের কাছে এবং ভালো মানের হোটেল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এজেন্টের সাথে এই ব্যাপারে আগে থেকেই পরিষ্কার বোঝাপড়া থাকা জরুরি। হোটেলের নাম আগে থেকেই জেনে নিবেন, এবং অনলাইনে এর লোকেশন এবং রিভিউ দেখে নিবেন। হোটেল নির্বাচনে যদি এজেন্টের বিবেচনার উপর নির্ভর করেন, ভালো রকম ভোগান্তির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

৭. ক্বাবা ঘরের সামনে বা মসজিদের ভিতর মোবাইল ফোন ব্যবহার না করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। এগুলো ইবাদতের জায়গা। ফোনে কথা বলা বা ছবি তোলার মতো কার্যক্রম অন্যের ইবাদত এবং মনোযোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।

আপনি নিজেই বিবেচনা করুন – কেউ একজন আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বা সেজদারত অবস্থায় বা চোখের পানি ফেলে দোয়া করছেন, আর আপনি ফোনে কথা বলছেন, সেলফি তুলছেন, হাসিহাসি চেহারায় বা ভাব নিয়ে ছবি তুলছেন, জোরে কথা বলছেন, এমনকি খেয়াল না করে ইবাদতরত ব্যক্তিকে ধাক্কাও দিলেন। যেহেতু এইগুলো দোয়া কবুলের জায়গা, বরং দোয়া করুন আল্লাহ যেন আপনাকে আবার এখানে আনেন এবং সাথে আপনার প্রিয়জনকেও আনেন যাকে আপনি ওখানে মিস করছেন, যার জন্য ছবি তুলতে চাচ্ছেন, বা যার সাথে ফোনে কথা বলতে চাচ্ছেন।

৮. “বেহেশতে আর কে যাবে বা না যাবে আমি পরোয়া করি না, আমি কিন্তু যাবোই”, এই মানসিকতা পরিহার করা উচিত। বিশেষ কিছু জায়গায় ইবাদতের গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে, যার প্রতি মানুষের প্রবল আগ্রহ আছে। ওই সব জায়গায় স্থান পাওয়াটা দুষ্কর। স্বাভাবিক ভাবে অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। চেষ্টা করা উচিত অবশ্যই, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ঠেলাঠেলি সম্পূর্ণ অনুচিত। যদি স্থান পাওয়া যায়, তাহলে যতটুকু সম্ভব নিজের ইবাদত সংক্ষেপ করা উচিত যেন অন্যরাও সুযোগ পায়। অন্যদেরও অধিকার আছে এখানে।

৯. কিছু ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড দেখা যাবে। কোনগুলো কুরআন-হাদিস সম্মত, আর কোনগুলো নয়, তার সম্পর্কে একটা ধারণা নিয়ে রাখলে ভালো।

১০. যেখানে সেখানে নামাজে দাঁড়ানো যা অন্যের চলাচলে অপ্রয়োজনীয় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, পরিহার করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত। অন্য দিকে, নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে বা তার গাঁয়ের উপর দিয়ে বা ধাক্কা দিয়ে চলাচল পরিহার করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত।

১১. তাওয়াফের সময় স্বাভাবিকভাবেই ভিড় থাকে। এই সময় অতিরিক্ত জিনিস (যেমন, ব্যাগ, জুতা, পানির বোতল) সাথে না থাকলে সুবিধা। সানগ্লাস পকেটে থাকলে ভাঙ্গার সম্ভাবনা ১০০%।

১২. জমজমের পানি ঠাণ্ডা ও ঠাণ্ডা ছাড়া দুই ধরণের আছে। ঠাণ্ডা খেলে কাশি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ঠাণ্ডা এবং ঠাণ্ডা ছাড়া মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে ভালো ঠাণ্ডাটা একদমই না খাওয়া। বিদেশে গিয়ে অসুস্থ হওয়াটা খুব একটা ভালো বিষয় না।

১৩. মসজিদের পাশেই ফার্মেসি আছে। তবে ওষুধের দাম খুবই বেশি। প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ (যেমন, জ্বর, সর্দি, কাশি, ব্যথা) বাংলাদেশ থেকে নিয়ে গেলেই ভালো।

১৪. মদিনায় মসজিদে নববীর পাশেই একটা হাসপাতাল আছে যেখানে বিনামূল্যে ডাক্তার দেখানো যায় এবং ওষুধও পাওয়া যায় বিনামূল্যে। মক্কায় মসজিদ আল-হারামের পাশে এমন হাসপাতাল আছে কিনা জানি না। প্রয়োজনে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।

১৫. ছেলেদের ন্যাড়া হওয়া আবশ্যক নয়, তবে এটি উত্তম বলা হয়। কারো যদি যে কোনো কারণেই হোক ন্যাড়া হওয়ার ব্যাপারে আপত্তি বা অসুবিধা থাকে, চুল নির্দিষ্ট পরিমাণে ছোট করলেই হবে। সুতরাং এই নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।

১৬. মক্কা মসজিদ আল-হারামের অনেক প্রবেশ পথ আজানের ১৫ মিনিট আগেই বন্ধ করে দেয়। নিজের পছন্দের জায়গায় নামাজ পড়তে চাইলে একটু আগেভাগে যাওয়াই উত্তম। বাহিরে ভিড় দেখে থেমে যাবেন না। মসজিদের ভিতরে বা সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।

১৭. ক্বাবা ঘরের সামনে নামাজের জায়গা চাইলে একটু আগে যাওয়াই উত্তম। আজানের সময় তাওয়াফরত থাকলে ঠিক সামনেই জায়গা পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে দখলদারিত্ব মনোভাব পরিহার করা উচিত। অন্যের ইবাদতের অসুবিধা সৃষ্টি করা থেকেও বিরত থাকা উচিত। ওখানে তাওয়াফ বড় ইবাদত। জায়গা দখল করতে গিয়ে অন্যের তাওয়াফে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা অন্যায় হবে।

১৮. নির্ধারিত স্থান ছাড়া জুতা রাখলে আর ফেরত নাও পেতে পারেন। মসজিদের ভিতর জুতা রাখার জায়গা আছে। ভালো হয় সস্তা এবং খুবই পাতলা দড়িঅলা পিঠ ব্যাগে জুতা রাখলে। যেখানে যাবেন, আপনার সাথে থাকবে। নামাজের সময় আপনার সামনে রাখলেন বা কাছের জুতার তাকে রাখলেন। হারানোর ভয় নাই।

১৯. বিশেষত মক্কায় খাওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা জরুরি। এমন খাবার না খাওয়াই উত্তম যা পেটের উপর চাপ সৃষ্টি করে বা ওযু ধরে রাখার জন্য অসুবিধাজনক। ওযু ভাঙলে বা টয়লেটে যেতে হলে হাঁটতে হতে পারে অনেক দূর। ফিরে এসে আপনার পছন্দের জায়গা হয়তো পাবেন না বা প্রবেশ পথও হয়তো বন্ধ পাবেন। টয়লেটের নিচের ফ্লোরে ভিড় কম থাকতে পারে।

২০. টয়লেট ব্যবহারে সচেতন হোন। ওখানে কি রেখে আসছেন তা অন্যের জানার প্রয়োজন নাই। ঠিক ভাবে ফ্লাশ করুন এবং সিট ভেজা রেখে আসবেন না। সাথে সবসময় টিস্যু রাখুন। আপনার কাজ শেষে সিটটা মুছে আসুন।

২১. দুপুরের সময় (জোহর-আসরের আগে-পরে) ক্বাবা ঘর চত্বরে থাকতে চাইলে, সানগ্লাস ব্যবহার সুবিধাজনক হবে। অন্যথায় সাদা টাইলস এর কারণে চোখের উপর চাপ পরবে।

২২. বেবি স্ট্রলার মসজিদের দরজা পর্যন্ত নেয়া যায়। দরজার বাহিরে রাখলে চুরি হবে না আশা করা যায়। স্ট্রলার খোলা রাখার নিয়ম আছে বোধহয়। হয়ত গুছিয়ে রাখার প্রয়োজনে সরানোর সুবিধার জন্য।

২৩. টডলার বেবি থাকলে বেবি স্ট্র্যাপ থাকলে সুবিধা হতে পারে। বিশেষত নামাজের সময় যেন বেশি দূর যেতে না পারে। বাচ্চা কান্নাকাটি করলে তাকে কোলে নিয়েও নামাজ পড়া সম্ভব।

২৪. ছোট বাচ্চার জন্য ললিপপ ধরণের চকোলেট সাথে থাকে খুবই প্রয়োজন। প্লেনে এবং মসজিদে জরুরি ভিত্তিতে কান্না থামানোর এটি একটি কার্যকরী মাধ্যম। অতিরিক্ত চিনি জাতীয় জিনিস খাওয়া যেহেতু স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না, খেয়াল করা প্রয়োজন এটা যেন স্বভাব হয়ে না দাঁড়ায়। (লজেন্স গলায় আটকানোর একটা ভয় থাকে। চকোলেট গলে কাঁদা-কাঁদা হয়ে যায়। এইজন্য ললিপপই উত্তম।)

২৫. রেস্টুরেন্টগুলোতে সাধারণত মাছ/মাংস/সবজির দামের মধ্যে ভাত বা এক-দুইটা নান/পরোটা অন্তর্ভুক্ত থাকে। সুতরাং নান/পরোটা/ভাত আলাদা অর্ডার দেয়ার আগে বিষয়টা জেনে নিন। টাকা বাঁচতে পারে। এছাড়া চেষ্টা করবেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত নান/পরোটা/ভাত না নেয়ার জন্য। যদি বিনামূল্যেও দেয়। অহেতুক খাবার নষ্ট করার দায় নেয়ার দরকার কি? আর এগুলো ঠাণ্ডা হয়ে গেলে খাওয়ার অযোগ্য। পরে খাবেন চিন্তা করে নিলেও আসলে খাওয়া সম্ভব না।

২৬. আন্তর্জাতিক ফুড ব্র্যান্ড সহজেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। দেশি খাবার থেকে কখনো কখনো এই বিদেশী খাবারের দাম কম মনে হতে পারে।

২৭. দামী জুতা, চশমা, ব্যাগ, ঘড়ি, ইত্যাদি না আনলেই ভালো। ভুলে কোথাও রেখে গেলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হতে পারে।

২৮. ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। ভুলক্রমে হাত থেকে নিচে পরে গেলে লজ্জা না পেয়ে তুলুন এবং নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। আদেশ দিয়ে নয় বরং নিজে করে দলের অন্য সদস্যদেরও উদ্বুদ্ধ করুন।

২৯. ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় টিকা দিয়ে নিন। এটা আপনার স্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্যই। পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে মানুষ আসে এখানে। অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অহেতুক না নেয়াই ভালো।

৩০. সাউদি এয়ারলাইন্স ইকোনমি ক্লাসে ২৩ কেজি দুইটি চেক-ইন লাগেজ এলাও করে। মোট ৪৬ কেজি। খেয়াল রাখবেন যেন একটা লাগেজ কোনো অবস্থায় ২৫ কেজির বেশি না হয়। অন্যথায় এয়ারপোর্টে আপনি হেনস্থার শিকার হতে পারেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য এয়ারলাইন্স ওয়েবসাইট বা প্রতিনিধির সাথে সরাসরি কথা বলুন।

৩১. ইনফ্যান্ট ছাড়া প্রতি পাসপোর্টের বিপরীতে একটা জমজমের পানির বোতল আনা যাবে, যা চেক-ইন সীমার (৪৬ কেজি) বাহিরে। ৭.৫ রিয়ালে ৫ লিটারের বোতল পাবেন। কেউ যদি বেশি আনতে চান ট্রিক হচ্ছে মূল লাগেজের মধ্যেই অতিরিক্তটুকু নিয়ে নেয়া।

৩২. প্লেনে নামাজ পড়ার আলাদা জায়গা থাকতে পারে। সেখানে নামাজ পড়লে সংক্ষেপে পড়ুন। অন্যদেরও সুযোগ দিন। খেয়াল রাখুন যে প্লেনে কয়েক শত যাত্রী আছে।

৩৩. অনেকে অনেক পরামর্শ দিবেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিজের। ধর্মীয় বিষয়গুলোতে মতভেদ থাকতে পারে। আপনার কোন মত পছন্দ সেটা আপনার ব্যাপার, অন্যের উপর চাপাচাপি করবেন না।

৩৪. অন্যের বিষয়ে কথা এবং অন্যের উপর পণ্ডিতি করবেন না। পারলে অন্যকে সাহায্য করুন। না পারলে, চুপ থাকুন। মসজিদ, বাস বা প্লেনে জোরে কথা বলবেন না। অন্যের ইবাদত বা বিশ্রামে অসুবিধা হয়।নয়া দিগন্ত

 

মতিহার বার্তা ডট কম – ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

 

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *